হজরত আদম (আ) -> পর্ব-০৩




আদম সৃষ্টি,ফেরেশতা প্রতি সিজদায় আদেশ এবং 

শয়তানের অস্বীকৃতি



আল্লাহ পাক হযরত আদম (আ) কে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন । তার 'খামীর' প্রস্তুত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহপাক ফেরেশতাগণকে অবহিত করলেন যে, তিনি মাটি দিয়ে এক জাতি সৃষ্টি করবেন । যার নাম হবে 'বাশার'(মানুষ)  এবং সে  তাঁর  প্রতিনিধিত্ব করবে। 

হযরত আদম (আ)-এর 'খামীর' মাটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে এবং এমন মাটি দিয়ে খামির করা হয়েছে যা নিত্যনতুন পরিবর্তনশীল ছিল । এ মাটি দিয়ে প্রস্তুত আদম (আ)-এর দেহাবয়ব শুকিয়ে পাকা মৃৎপাত্র খন্ডের ন্যায় হয়ে গেল এবং খামিরে আঘাত করলে ঠনঠন  করতে লাগল, তখন আল্লাহ তায়ালা সে মাটির নির্মিত দেহাবয়বের  ভিতরে 'রূহ' ফুঁকে দিলেন এবং সাথে সাথে তাতে গোশত, চর্ম, হাড়, রগ, শিরা, উপশিরা ইত্যাদি জীবন্ত মানুষ হয়ে গেল এবং ইচ্ছাশক্তি জ্ঞান-বুদ্ধি এবং শিক্ষালাভের প্রেরণা ও ভাবের অবস্থার অধিকারীরূপে দেখা গেল । তখন ফেরেশতাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন, "তোমরা এর সামনে সিজদায় পতিত হও ।"  সাথে সাথে সকল ফেরেশতা আল্লাহ পাকের আদেশ পালন করলেন । কিন্তু ইবলিশ(শয়তান) গর্ব ও অহংকার সাথে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল । 

এই সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন -

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا

إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ ۗ

أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِي

- وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ ۚ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا



উচ্চারণ ঃ ওয়াইয কলনা লিলমালাইকাতিস জুদু লিআদামা ফাসাজুদু ইল্লা ইবলিসা, কানা মিনাল জিন্নি ফাফাসাকা আন আমরি রাব্বিহি,  আফাতাত্তাখিজুনাহু ওয়া জুররিয়াতাহ আওলিয়াআ মিনা দুনী ওয়াহুম লাকুম আদুউম। বি'সা লিযজালিমীনা বাদালা।

-সূরা কাহফ ঃ ৫০


অর্থ ঃ আর যখন এরূপ ঘটেছিল যে, আমি ফেরেশতাদেরকে আদেশ করলাম,- "আদমের সামনে সিজদা কর, তখন সকলেই সিজদা করল, কিন্তু ইবলিশ সিজদা করল না ।সে জীন জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতএব, সে  স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ লঙ্ঘন করল । অতঃপর তোমরা কি আমাকে ছেড়ে অন্যকে ডাক এবং তার বংশধরদেরকে কার্যনির্বাহক সাব্যস্ত করেছি ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু; জালেমদের জন্যে কেমন নিকৃষ্ট  পরিবর্তন হল ।

কোরআনে আরো  বর্ণিত রয়েছে  যে,

- إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّن طِينٍ

- فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ

- فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ

- إِلَّا إِبْلِيسَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ



উচ্চারণ ঃ ওয়াইয কালা রাব্বুকা লিলমালাইকাতি ইন্নি খালিকুম বাশারুম মিন  ত্বীন । ফাইযা সাওয়াইতুহু ওয়া নাফাখতু ফিহি মির রুহি ফাকাউ লাহা সাজিদীন । ফাসাজাদা মালাইকাতু কুল্লুহুম আজমাউন ।
ইল্লা  ইবলীসা । ইস্তাকবারা  ওয়াকানা মিনাল কাফিরীন ।

-সূরা ছোআদ ঃ ৭১-৭৪

অর্থ ঃ  আর সে সময়ের  কথা স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি মাটি দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করব । আমি যখন তাকে তৈরি করব এবং রূহ ফুঁকে দিব, তখন তোমরা সকল ফেরেশতা তার সামনে সিজদায় পতিত হবে । অতএব, সমস্ত তার সামনে সিজদায় পতিত হল । কিন্তু ইবলিশ সে আদেশ অমান্য করল অহংকার করল এবং সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত ছিল ।

 

আল্লাহর সাথে ইবলিশের  বিতর্ক 



আল্লাহ তায়ালা যদিও অন্তর্যামী এবং মনের গুপ্ত কথাসমূহও অবগত আছেন এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ  সবই তাঁর কাছে সমান । কিন্তু পরীক্ষার জন্য শয়তানকে প্রশ্ন করলেন ঃ

  ؕ مَا مَنَعَكَ اَلَّا تَسۡجُدَ اِذۡ اَمَرۡتُكَ


উচ্চারণ ঃ মা মানায়াকা আল্লা তাসজুদা ইয আমারতুকা ।

অর্থ ঃ কোন  বিষয়টি তোমাকে সিজদা করতে বারণ করল যখন আমি স্বয়ং স্বয়ং তোমাকে আদেশ করেছি ।


- اَنَا خَيۡرٌ مِّنۡهُ​ ۚ خَلَقۡتَنِىۡ مِنۡ نَّارٍ وَّخَلَقۡتَهٗ مِنۡ طِيۡنٍ‏



উচ্চারণ ঃ আনা  খায়রুন মিনহু খালাতানী মিন নারিন ওয়া খালাকতাহু মিন  তীন ।

অর্থ ঃ  এ বিষয়টি যে, আমি আদমের চেয়ে উত্তম । আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন  এবং আদমকে মাটি  দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ।

- সূরা আরাফ ঃ ১২


এতে শয়তানের উদ্দেশ্য ছিল যে,"আমি আদমের চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন । কেননা, আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং আগুন ঊর্ধ্বগামী আর আদম মাটির সৃষ্টি । আগুনের সাথে মাটির কোনই  তুলনা হতে পারে না । হে আল্লাহ আপনি যে আদেশ করলেন- "আগুনের সৃষ্টি মাটির সৃষ্টিকে সিজদা করুক ।" আপনার এই আদেশটি কি সঠিক হয়েছে ? আমি সর্বাবস্থাতেই আদম এর চেয়ে উত্তম।সুতরাং সে আমাকে সিজদা করুক । আমি তার সামনে মাথা অবনত করব কেন ?" 

কিন্তু হতভাগা শয়তান নিজের গর্ব ও অহংকার এর কারণে এই কথা ভুলে গেল যে, যখন সে এবং আদম  উভয়ে  আল্লাহ পাকের সৃষ্ট ।  তখন সৃষ্ট জীবের মূল তথ্য  স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্ট জীব বেশি জানতে পারে না । শয়তান নিজের অহংকারবশতঃ এ কথাটি বুঝতে অক্ষম ছিল যে, মর্যাদার উচ্চতা এবং নিম্নতা সে মূল  পদার্থের ভিত্তিতে নয় যা দিয়ে কোন সৃষ্ট জীবের  'খামীর' প্রস্তুত করা হয়েছে; বরং তার ভিক্তি সে সমস্ত গুণাবলীর উপর স্থাপিত যা সমস্ত সৃষ্টির সেরা জীবের মধ্যে সন্নিবেশ করেছেন ।

শয়তানের জবাবের ভিত্তি যেহেতু  অহংকার ও গর্বের মূর্খতা ছিল, সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাকে স্পষ্ট বলে দিলেন যে, মূর্খতাজনিত গর্ব ও অহংকার তোকে এত অন্ধকার করে দিয়েছে যে, তুই নিজের স্রষ্টার মর্যাদা ভুলে গেছিস, সে কারণে আমাকে অন্যায় আচরণকারী  সাব্যস্ত  করেছিস এবং একথা বুঝতে পারলি না যে, তোর মূর্খতা তোকে প্রকৃত তথ্য হৃদয়ঙ্গম করতে  করতে অক্ষম ও অপারগ করে দিয়েছে । অতএব, তুই এখন এ অবাধ্যতার জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামে উপযুক্ত হয়ে গেলি এবং এবং এটাই তোর কাজের উপযুক্ত প্রতিফল ।




বিশেষ দ্রষ্টব্য ঃ উল্লিখিত  অংশের অধিকাংশই "মাওলানা ক্বারী মোহাম্মাদ হাসান " -  এর "কোরআন  হাদিসের আলোকে কাসাসুল আম্বিয়া" - বইটির থেকে  সংগৃহীত করা হয়েছে ।"

ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ