হজরত আদম (আ) -> পর্ব-০৪






ইবলিস আল্লাহ্‌  তাআলার কাছে অবকাশ প্রকাশ করল




ইবলিস যখন দেখল যে, আল্লাহ্‌র আদেশ অমান্য করা, গর্ব ও অহংকার করা এবং আল্লাহ্‌ পাকের প্রতি অন্যায় আচরণের দোষারপ করার অপরাধগুলো তাকে রাব্বুল আলামীনের রহমতের দরবার থেকে বিতারিত এবং বেহেশত থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে, তখন সে অনুতপ্ত  ও লজ্জিত হয়ে তওবা করার পরিবর্তে আল্লাহ্‌ পাকের কাছে এ দাবি করল যে, ''কিয়ামত  পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দান করুন,দীর্ঘ সময়টুকুর জন্য আমার আয়ু বৃদ্ধি করে দিন ।"

আল্লাহ্‌ পাকের ইচ্ছা এটাই । সুতরাং, তিনি ইবলিসের দাবি মঞ্জুর করলেন । এটা শুনে এখন সে আর একবার নিজের শয়তানি ভাব প্রকাশ করল  এবং বলল আপনি যখন আমাকে  আপনার দরবার হতে বিতারিত করে দিলেন; তখন যে আদমের কারনে  এ অপমান ও লাঞ্ছনা আমার ভাগ্যে জুটল, আমিও আদমের সন্তানদেরকে পথভ্রষ্ট করব  এবং তাদের পিছনে,সামনে চারদিক থেকে তাদেরকে গোমরাহ করব এবং তাদের অধিকাংশকে আপনার অকৃতজ্ঞ ও নাফরমান করে ছাড়ব ।
অবশ্য আপনার খাঁটি বান্দাগণকে পথভ্রষ্ট করতে পারব না ।তারা সম্পুরনভাবে সুরক্ষিত থাকবে ।

আল্লাহ্‌ পাক বলেন, তাতে আমার কোন পরোয়া  নেই । আমার সৃষ্টির বিধান 'কর্মের বিনিময় ও কর্মের প্রতিফল' অটল বিধান । যে যেমন কাজ করবে, সে তেমনই ফল ভোগ করবে । আর যে আদম সন্তান আমার হতে মুখ ফিরিয়ে  তোর পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে তোরই সাথে জাহান্নামের উপযোগী হবে । নিজের অনুসারীদের নিয়ে চিরস্থায়ী অভিশাপ ও জাহান্নামের অপেক্ষা করতে থাক ।

  এ সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তায়ালা  কোরআনে ঘোষণা করেন যে,

 

قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا لَكَ أَلاَّ تَكُونَ مَعَ السَّاجِدِينَ -

قَالَ لَمْ أَكُن لِّأَسْجُدَ لِبَشَرٍ خَلَقْتَهُ مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ -

قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ -

وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ -
قَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ -
قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ -
إِلَى يَومِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ -
قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الأَرْضِ وَلأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ -
إِلاَّ عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ -
قَالَ هَذَا صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ - 
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلاَّ مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ -
وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ -

  

উচ্চারণ ঃ ক্ব-লা ইয়া য় ইব্লীসু মা-লাকা আল্লা-তাকূনা মাআস্ সা-জ্বিদীন্। -লা লাম্ আকুল্লি আস্জুদা লিবাশারিন্ খলাক্বতাহূ মিন্ ছল্ছোয়া-লিম্ মিন্ হামায়িম্ মাস্নূন্। ক্ব-লা ফাখ্রুজু মিন্হা-ফাইন্নাকা রাজ্বীম্। অ ইন্না আলাইকাল্ লানাতা ইলা-ইয়াওমিদ্দীন্। ক্ব-লা রব্বি ফাআর্ন্জিনী য় ইলা-ইয়াওমি ইয়ুব্আছ্ন্। ক্ব-লা ফাইন্নাকা মিনাল্ মুন্জোয়ারীন্ । ইলা-ইয়াওমিল্ অক্বতিল্ মালূম্। ক্ব-লা রব্বি বিমা য় আগ্ওয়াইতানী লাউযাইয়্যিনান্না লাহুম্ ফিল্ র্আদ্বি অলা উগ্ওয়িইয়ান্নাহুম্ আজুমাঈন্। ইল্লা-ইবা-দাকা মিন্হুমুল্ মুখলাছীন্। ক্ব-লা হা-যা- ছিরা-তুন্আলাইয়্যা মুস্তাক্বীম্। ইন্না ইবা-দী লাইসা লাকা আলাইহিম্ সুল্ত্বোয়া-নুন্ ইল্লা-মানিত্তাবা‘আকা মিনাল্ গ-ওয়ীন্। অইন্না জ্বাহান্নামা লামাওইদুহুম্ আজুমাঈন্।


-সূরা হিজরঃ ৩২-৪৩ 


অর্থ ঃ হে ইবলিস ! তোমার কি হল যে সিজদাকারীদের সাথে যোগদান করলে না ? ইবলিস বলল, আমার দ্বারা এটা সম্ভব নয় যে, এমন একজন মানুষকে সিজদা করি যাকে আপনি খামীরকৃত মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন । যা শুষ্ক হয়ে ঠন ঠন শব্দে বাজতে থাকে । আল্লাহ্‌ পাকের নির্দেশ হল, যদি অবস্থা এরূপই হয়, তবে এখান থেকে বের হয়ে যাও, কেননা, তুমি আমার দরবার থেকে বিতাড়িত এবং প্রতিফল দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি অভিশাপ । সে বলল, হে আল্লাহ্‌ ! আমাকে সে দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন, যেদিন সমস্ত সৃষ্টি পুনরায় জীবিত করে কবর থেকে উঠানো হবে ।   

আল্লাহ্‌ তায়ালা বললেন, সে নির্দিষ্ট সময়ের দিন  পর্যন্ত তোমাকে অবকাশ দেওয়া হল । ইবলিস বলল, হে আল্লাহ্‌ ! যেহেতু আমার পথ বন্ধ করে দিলেন, তাই এখন আমি অবশ্যই এরূপ করব যে, পৃথিবীতে তাদের জন্য প্রবঞ্চনামূলক শোভা ও সৌন্দর্য প্রকাশ করে দিব এবং অবশ্যই তাদেরকে বিভ্রান্ত করে দিব।তবে তাদের মধ্যে থেকে যারা আপনার খাঁটি বান্দা তারা আমার ধোঁকায় পড়বে না । আল্লাহ্‌ তায়ালা বললেন, এটাই আমার সরল পথ, যা আমার কাছ থেকে অবতীর্ণ । যারা আমার খাঁটি বান্দা তাদের উপর কোন ধোঁকাবাজি চলবে না, শুধু ঐ সমস্ত লোকের উপর চলবে, যারা ইবাদতের পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং তাদের সকলের জন্য  দোজখের আজাবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ।


মহান আল্লাহ্‌ কোরআনে আরো বলেন - আর যখন আমি ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, আদমের সামনে সিজদায় পতিত হও, তখনই সকলেই  সিজদায় পতিত হল । কিন্তু ইবলিস সিজদা করল না । সে বলল, আমি কি এমন সৃষ্টিজীবকে সিজদা করব যাকে আপনি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ? সে আরো বলল, আপনার কি এ সিদ্ধান্তই হল যে, আপনি এ নিকৃষ্ট সৃষ্টিকে আমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করলেন ? আপনি যদি আমাকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দেন, তবে আমি অবশ্যই তার বংশধরের মূল উৎপাটন করে ফেলব । অতি সামান্য লোকই ধ্বংসলীলা হতে রক্ষা পাবে আর কেউ রক্ষা পাবে না । 
আল্লাহ্‌ তায়ালা বললেন যা, তোমার নিজের পথ ধর । তাদের মধ্যে যে তোমার পথ অনুসরণ করবে, তবে তাদের জন্য ও তোমার জন্য দোজখের শাস্তি অবধারিত । তাদের মধ্যে থেকে যেকোনো  ব্যক্তিকে তুমি নিজের আওয়াজ শুনিয়ে বিভ্রান্ত করতে পার,করতে চেষ্টা কর, নিজের সেনাবাহিনীর অশ্বারোহী ও পদাতিক দল নিয়ে আক্রমণ কর, তাদের ধন-সম্পদে ও সন্তান-সন্তিতে অংশীদার হয়ে যাও এবং তাদের সাথে বিভিন্ন রকমের  ওয়াদা কর, বস্তুতঃ সয়তানের ওয়াদা তো সরাসরি ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয় । যারা আমার (খাঁটি)  বান্দা তাদের উপর তুমি কখনো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না । আর তোমার প্রতিপালক(আল্লাহ্‌) কার্য নির্বাহের জন্য যথেষ্ট ।

-সূরা বনী ইসারাইলঃ ৬১-৬৫ 


মহান আল্লাহ্‌ পাক কোরআনে আরো বলেন - হে ইবলিস ! কিসে তোকে বারণ করল সে বস্তুকে  সিজদা করতে যাকে আমি আমার (কুদরতের) হস্তদ্বয় দিয়ে সৃষ্টি করেছি । তুই কি অহংকার করেছিস নাকি মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ ? ইবলিস বলল, আমি তা হতে শ্রেষ্ঠ । আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন দিয়ে এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে । আল্লাহ্‌ পাক বললেন, তবে তুই  এখান থেকে বের হয়ে যা। কেননা, তুই আমার দরবার থেকে বিতাড়িত হয়েছিস । আর তোর উপর আমার লা'নত কিয়ামত দিবস পর্যন্ত, যে দিন সমস্ত মৃত পুনর্জীবিত হবে । আল্লাহ্‌ পাক বলেন, তোকে অবকাশ দেওয়া হল সে নির্দিষ্ট ও পরিজ্ঞাত সময়ের দিবস পর্যন্ত । ইবলিস বলল, আপনার  ইজ্জতের কসম ! আমি তাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করে দিব; কিন্তু তাদের মধ্যে হতে আপনার খাঁটি বান্দাগণকে পারব না । আল্লাহ্‌ পাক বললেন, তবে সেটা সত্য কথা এবং আমি সত্য কথাই বলে থাকি । আমি অবশ্যই দোজখকে পূর্ণ করব, তোর দ্বারা এবং যারা তোর অনুসরণ করবে তাদের সকলের দ্বারা ।

  - সূরা ছোয়াদ ঃ ৭৫-৮৫



বিশেষ দ্রষ্টব্য ঃ উল্লিখিত  অংশের অধিকাংশই "মাওলানা ক্বারী মোহাম্মাদ হাসান " -  এর "কোরআন  হাদিসের আলোকে কাসাসুল আম্বিয়া" - বইটির থেকে  সংগৃহীত করা হয়েছে ।"

ধন্যবাদ। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ