হজরত আদম (আ) -> পর্ব-০৭


 


ইবলিসের দুনিয়ায় আগমন 


মহান আল্লাহর আদেশে  ফেরেশতারা শেষবার জিনদেরকে হত্যা করার পরও পাহাড়-পর্বত ও বনে-জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে কিছুসংখ্যক জিন প্রাণ রক্ষা করেছিল । তাদের বংশ বৃদ্ধি পেয়ে আবার জিনদের দিয়ে দুনিয়া পরিপূর্ণ হয়ে গেল । কিন্তু তাদেরকে হেদায়েত করার জন্য পয়গম্বর বা আল্লাহর দূত ছিল না। জিন জাতি ভীষণ পাপাচারী হয়ে উঠেছিল । আল্লাহ পাক ইবলীসকে আদেশ করলেন, ''হে ইবলিস ! তোমার ইবাদত-বন্দেগী ও আমার প্রতি তোমার আনুগত্যে আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি । এবার তোমার প্রতি আমার নির্দেশ হল তুমি দুনিয়াতে গিয়ে তোমার স্বজাতীয় জিনদেরকে হেদায়েত প্রদান কর।''

আল্লাহ তায়ালার এ নির্দেশ শুনে ইবলিস বলল, 'হে মাবুদ ! আপনার নির্দেশ আমি অবশ্যই পালন করব, তবে আমার একটি আরজ হল আপনি আমাকে এমন ক্ষমতা দান করুন, যেন সারাদিন দুনিয়াতে জিনদেরকে হেদায়েত করে সন্ধ্যায় আবার আমি এখানে ফিরে এসে সারারাত আপনার ইবাদত ও ফেরেশতাদেরকে নসিহত করতে পারি' ।  

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইবলিসের এ আবেদন কবুল করলেন । তখন ইবলিস অত্যন্ত আনন্দ চিত্তে দুনিয়ায় নেমে আসল এবং জিনদেরকে হিদায়েতের কাজে আত্মনিয়োগ করল । কিন্তু একাধারে বহুদিন পর্যন্ত সে আপ্রাণ চেষ্টা ও পরিশ্রম করা সত্ত্বেও সামান্য কিছু সংখ্যক জিন ব্যতীত প্রায় সকলেই ইবলিসের বিরুদ্ধাচরণ করতে লাগল । তখন ইবলিস আবার আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করল, হে মাবুদ ! আমাকে এমন ক্ষমতা দিন যাতে এ অবাধ্যচারী জিনদেরকে আমি সমূলে ধ্বংস করতে পারি । 

মহান আল্লাহ তায়ালা ইবলিসের এ আবেদন শুনে জিনদেরকে ধ্বংস করার জন্য আসমান থেকে ফেরেশতা প্রেরণ করলেন, ফেরেশতাদের সঙ্গে ইবলিসের অনুগত অনেক জিনও যোগদান করল ।  ফেরেশতা ও ইবলিসের বাধ্যগত জিনদের আক্রমণে কিছুসংখ্যক পথভ্রষ্ট জিন সৎপথ অবলম্বন করে তাদের প্রাণ রক্ষা করল । বাকি সমস্ত পাপী জিন প্রাণ হারাল । আল্লাহর দরবারে তার কৃত সিজদাহর সংখ্যা যে কত ছিল, তা কারও পক্ষে হিসাব করা সম্ভব নয় ।


ইবলিসের লাওহে মাহফুজ দর্শন

ইবলিস  আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাল হে প্রভু ! তোমারই অসীম অনুগ্রহে আমি অতি সামান্য স্তর থেকে সম্মানের অতি উচ্চস্তরে পৌঁছেছি । তোমারই অসীম অনুগ্রহে আমি তোমার নৈকট্য লাভ করতে সমর্থ হয়েছি । এখন আমার মনের একান্ত বাসনা হল তোমার পবিত্র লাওহে মাহফুজ দর্শন করে আমার জীবন ধন্য ও সার্থক করি । তুমি অনুগ্রহ করে আমার এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ কর । আল্লাহ্‌ তায়ালা ইবলিসের প্রার্থনা কবুল করে মিকাইল ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেন, ইবলিসকে পবিত্র লাওহে মাহফুজের একান্ত নিকটে নিয়ে দেখিয়ে আনার জন্যে । 
আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী   হযরত মিকাইল (আ) ইবলিসকে লাওহে মাহফুজের  নিকটে নিয়ে গেলেন । ইবলিস সেখানে পৌঁছে এক দৃষ্টিতে লাওহে মাহফুজের দিকে তাকিয়ে অদৃষ্টলিপি পাঠ করতে লাগল । হঠাৎ এক স্থানে তার দৃষ্টি পড়ল, সেখানে লিখিত রয়েছে- আল্লাহর এক বান্দা ছয় লক্ষ বছর পর্যন্ত তার মাবুদের ইবাদত করবে । কিন্তু অবশেষে আল্লাহর একটি আদেশ অমান্য করে সে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হবে । ঐ বান্দা আসমান ও যমীনে মালাউন নামে পরিচিত হবে । ইবলিস এ লিপি পাঠের পর আপনা হতে কেঁদে ফেলল এবং এবং সিজদায় পতিত হল এবং সিজদায়  সে দীর্ঘ ছয় হাজার বছর অতিবাহিত করল । ছয় হাজার বছর পর মাথা তুলে দেখতে পেল তাঁর সিজদাহর জায়গায় লিখিত আছে-


  لعنة الله مرحبا على إبليس


উচ্চারণ ঃ 'লা'আনাতুল্লা-হি 'আলা-ইবলীস' ।
অর্থ ঃ ইবলিসের উপরে আল্লাহ্‌র অভিশাপ বর্ষিত হোক ।

ইবলিস আরজ করল, হে আমার রব ! ইবলিস কে ? তাকে দেখিয়ে দিন । আমি তাকে যথোচিত সিক্ষা দান করি । জবাবে আল্লাহ্‌ তায়ালা ইবলিসকে বললেন, অচিরেই তুমি তাকে দেখতে পাবে । এ ক্থা শুনে ইবলিস সেখানে দাঁড়িয়ে এক হাজার বছর পর্যন্ত পাঠ করল,  'লা'আনাতুল্লা-হি 'আলা-ইবলীস'- ইবলিসের উপর আল্লাহ্‌র লা'নত বর্ষিত হোক । তখন আল্লাহ্‌ পাক ইবলিসকে বললেন, ওহে ! আমার যে বান্দা আমার অশেষ অনুগ্রহ লাভ করেও আমার হুকুম অমান্য করবে, তাঁর কেমন শাস্তি হওয়া উচিত ? জবাবে ইবলিস বলল, হে আমার রব ! এরূপ অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর আপনার কঠিন শাস্তি ও অভিশাপ বর্ষিত হওয়া উচিত ।


ইবলিসের মনে কুমতলব ও অহঙ্কারের সূত্রপাত

একদিনে ইবলিস মনে মনে ভাবল- এখন তো ফেরেশতা জগতে ও জিনের রাজ্যে এমন কোন ফেরেশতা বা জিন নেই যে আমার কোনো নির্দেশ অমান্য করে । কেননা, আসমান যমীন বা জিন ও ফেরেশতাদের মধ্যে আমার প্রভাব এখন অতুলনীয় । আমার প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার সাথে মোকাবেলা করার মত এখন আর কেউ নেই । এমতাবস্থায় যদি কোনো কারণবশতঃ আল্লাহ তায়ালা নিজের দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন কিংবা স্বেচ্ছায় ঘোষণা করেন যে, আমি এখন এ সৃষ্টি জগত পরিচালনার দায়িত্ব হতে অবসর গ্রহণ করছি । অতএব, এখন তোমাদের মধ্য থেকে যোগ্যতম ব্যক্তি আমার সৃষ্টজগতের পরিচালনার ভার গ্রহণ কর তাহলে নিশ্চয়ই একমাত্র আমি এ পদের সুযোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে এ দায়িত্ব গ্রহণ করে তা পালন করতে পারব । এখন আর আমি কোন দিক দিয়েই আল্লাহ পাক অপেক্ষা হীনবল ও কম ক্ষমতাবান নই । সমস্ত ফেরেশতা ও জিনদের উপর এখন আমার যে রূপ প্রভাব, তাতে আল্লাহ পাকের সাথে আমার কোন ব্যাপার নিয়ে বিরোধে অবশ্যই তারা আমার পক্ষাবলম্বন করবে ।

লাওহে মাহফুজ দর্শনে ফেরেশতারা

ফেরেশতারা লাওহে মাহফুজে লিখিত দেখতে পান যে, অচিরেই আমার জনৈক বান্দার প্রতি চিরদিনের জন্য আমার লা'নত বর্ষিত হবে ।এ লেখা পড়ে ফেরেশতারা ভয়ে অস্থির হল । তারা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল । তারা শঙ্কিত হয়ে পড়ল । হায়, না জানি  তাদের মধ্যেই কোন হতভাগ্য বান্দার উপরে এ দুর্ভাগ্য নেমে আসবে । ফেরেশতারা এ দুশ্চিন্তায় কেঁদে কেঁদে হয়রান পেরশান হয়ে সকলে মিলে তাদের ওস্তাদ ইবলিসের নিকট হাজির হল । ইবলিস  এর কারণ জানতে চাইলে ফেরেশতারা বলল ওস্তাদ ! ঐ যে পড়ে দেখুন; লাওহে মাহফুজের লেখা পড়ে আমাদের সকলেরই মনে দারুন আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে । আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুন যাতে আমরা আল্লাহর লা'নত থেকে রক্ষা পেতে পারি ।
 
ইবলিস  ফেরেশতাদের মিনতিতে তাচ্ছিল্যের  সাথে মুচকি হেসে আল্লাহ দরবারে প্রার্থনা করল, 'হে মাবুদ ! তুমি ফেরেশতাদের কারো উপর লা'নত দিও না । আল্লাহ তায়ালা ইবলিসের ঐ প্রার্থনা কবুল করলেন। ফেরেশতারা আল্লাহ্‌র সে নির্ধারিত গযব থেকে রক্ষা পেল । কিন্তু ইবলিস সমগ্র ফেরেশতার জন্য দোয়া করল বটে কিন্তু অহংকারবশতঃ নিজের জন্য দোয়া করতে ভুলে গেল । এর কিছুদিন পর একদিন ইবলিস আরশে মুআল্লায়  আক্ষানা তখতির  উপরে উজ্জ্বল নূরের হরফে  'আঊ'যুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বা-নির রাজীম'- "বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি"  লিখিত দেখতে পেল । এ লেখা পাঠ করে ইবলিস অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে আল্লাহর নিকট জিজ্ঞেস করল, হে মাবুদ! কে সেই দুষ্ট শয়তান যার নিকট হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য তোমার কাছে প্রার্থনা করার কথা লেখা আছে ? আল্লাহ তায়ালা জবাব দিলেন, তুমি শিঘ্রই তাকে চিনতে পারবে ।


বিশেষ দ্রষ্টব্য ঃ উল্লিখিত  অংশের অধিকাংশই "মাওলানা ক্বারী মোহাম্মাদ হাসান " -  এর "কোরআন  হাদিসের আলোকে কাসাসুল আম্বিয়া" - বইটির থেকে  সংগৃহীত করা হয়েছে ।"

ধন্যবাদ । 



    


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ