হজরত আদম (আ) -> পর্ব-০৬


হজরত আদম,হজরত আদম (আ),Hazrat Adam,Hazrat Adam (a)


ইবলীসের ইতিহাস


 বাদশাহ হামুসের পুত্র ছিল ইবলীস । তাঁর নাম ছিল খবীস । খবীসের আকৃতি ছিল ভয়ঙ্কর এক সিংহের মত আর স্বভাব প্রকৃতিও সিংহের ন্যায়ই ছিল । একদিকে তাঁর দেহে ছিল পঞ্চ শক্তি অন্যদিকে তার চেহেরায় ছিল সুস্পষ্ট ধূর্ততার ছাপ । এ খবীসই ছিল পাপিষ্ঠ জিনদের নেতা । ইবলিসের মাতার নাম ছিল নিলবিস । নিলবিস জিন দেখতে ঠিক একটি নেকড়ে বাঘের মত । তাঁর প্রকৃতিও  ছিল অবিকল নেকড়ের ন্যায় । এক বর্ণনায় আছে, জাহান্নামের আগুনের খবীস ও নিলবিস এর মিলনে ইবলিসের জন্ম হয় । সুতরাং পিতামাতা ও জাহান্নাম এ ত্রিস্বত্তার স্বভাব ও প্রকৃতির সম্পূর্ণ  প্রভাবই ইবলিসের চরিত্রে বিদ্যমান ছিল । ইবলিসের পিতার সারবুক নামে সর্ববিদ্যায় পারদর্শী একজন বন্ধু ছিল । খবীসের পুত্র ইবলিসের শিক্ষা-দীক্ষার ভার তাঁর পিতা উক্ত বন্ধু সারবুকের হাতে অর্পণ করেছিল । ইবলিস ছিল অতিশয় মেধাবী ও সৃতিশক্তি সম্পন্ন । সে একবার যা শুনত তাই সে চিরদিনের জন্য মনে রাখত ।
সারবুকের মনে ইবলিস সম্পর্কে অত্যন্ত  উচ্চ  ধারণা জন্মেছিল। তাকে পড়াতে শুরু করে সে তাঁর বন্ধু খবিসকে লক্ষ্য করে প্রাই বলত,বন্ধু ! তোমার পুত্রের ভিতরে  যে লক্ষণসমূহ দেখছি  তাতে মনে হচ্ছে যে, সে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এক মহা বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হবে । আমার শিক্ষাকতা জীবনের ছাব্বিশ হাজার বছরের মধ্যে তোমার ইবলিসের মত এত তীক্ষ্ণ সৃতিশক্তিসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান ছাত্র আমার হাতে আর দ্বিতীয়টি পড়েনি । কিন্তু দুক্ষের বিষয় তোমার পুত্র অত্যধিক বেয়াদব,অহঙ্কারি এবং ভীষণ একগুঁয়ে । 


ইবলিস প্রথম আসমানে

ফেরেশতারা তাকে প্রথম আসমানে নিয়ে নিজেদের প্রকৃতি ও স্বভাব অনুসারে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীর নিয়ম-কানুন শিক্ষা দিল । ইবলিস স্বীয় প্রতিভাবলে অতি অল্প সময়ে শিক্ষা লাভ করে দীর্ঘ এক হাজার  বছর প্রথম আসমানে আল্লাহর ইবাদত করল । তথাকার ফেরেশতারা তার ইবাদতে একাগ্রতা ও দেখে অবাক হয়ে বলল যে, আমরা ফেরেশতা জাতি শুধু আল্লাহর  ইবাদতের এর জন্যই সৃষ্টি হয়েছি । ইবাদতই আমাদের একমাত্র কাজ । তবু কি আশ্চর্য ! ইবলিস আমাদের কাছে ইবাদতের কায়দা-কানুন সে যে ইবাদত করছে, তাতে  তার ইবাদত অনেক উচ্চ পর্যায়ের না । আমাদের ফেরেশতারাদের মধ্যে তো কাকেও  এমন ধারায় ও এমন নিবিড় ভাবে কখনও ইবাদত করতে দেখি নি । ফেরেশতারা তার ইবাদত  বন্দেগী দেখে খুবই মুগ্ধ হল ।


ইবলিস দ্বিতীয় আসমানে

ইবলিশ প্রথম আসমানে এক হাজার  বছর ইবাদতের পর দ্বিতীয় আসমানের ফেরেশতারা অতি আদর করে তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে গেল । ইবলিস দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছেও পূর্বাপেক্ষা আরো বেশি পরিমাণে এবাদতে মশগুল হল । এই আসমানের ফেরেশতারা তার ইবাদত দেখে খুশি হল এবং তার প্রশংসা করতে লাগল এবং তারা ইবলিস এর নামকরণ করল 'আবেদ' । দ্বিতীয় আসমানে এক হাজার বছর অবস্থানের পর তৃতীয় আসমানের ফেরেশতারা ইবলিসকে তৃতীয় আসমানে নিয়ে গেল । তৃতীয় আসমানে এসে সে আরও বেশি পরিমাণে পরম একাগ্রতা ও মনোযোগের সাথে আল্লাহর ইবাদত শুরু করে দিল । সে এখানেও এক হাজার বছর ইবাদত করল । এখানের ফেরেশতারা তার ইবাদতে মুগ্ধ হয়ে তার নাম রাখল 'অলি'।  তারপর চতুর্থ আসমানের ফেরেশতারা আল্লাহর অনুমতি লাভ করে ইবলিসকে চতুর্থ আসমানে নিয়ে গেল । ইবলিস  এখানেও অত্যন্ত একাগ্রতার দীর্ঘ এক হাজার বছর আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মশগুল রইল । সেখানকার ফেরেশতারা তার ইবাদতে খুশি হয়ে নাম রাখল 'ছালেহ' । এভাবে অবশিষ্ট সকল আসমানে উন্নীত হয়ে প্রত্যেক আসমানে  এক হাজার বছর করে ইবাদত করল । তখন সমস্ত ফেরেশতা তাহার প্রশংসায় মুখরিত হয়ে গেল । সকল ফেরেশতার সন্তুষ্টির ভেতর সে সপ্তম আসমানে উপনীত হয়ে পরম সুখে শান্তিতে বসবাস শুরু করল । ইবলিস ফেরেশতাদের নিকট থেকেই আদব-কায়দা এবং ইবাদতের রীতি-নীতি শিক্ষা করেছিল । ইবলিস অত্যন্ত মেধাবী যা শিক্ষা লাভ করত তার কোনো কিছুই আর  ভুলত না ।সুতরাং অতি অল্প সময়ে ফেরেশতাদের নিকট সে সর্ববিষয়ে এত বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করল যে, এখন তাঁর ওস্তাদ ফেরেশতাদের তুলনায় তার জ্ঞানই বেশি হয়ে গেল । তদ্রূপ ফেরেশতাদের ইবাদতের পরিমাণ  অপেক্ষা তার ইবাদতের পরিমাণ অনেক বেশি হতে লাগল । ফেরেশতারা ইবলিসের  ইবাদত-বন্দেগী দেখে উপলব্ধি করতে লাগল যে, ইবলিসকে তারা শিক্ষা দান করেছে,  এখন সেই ইবলিসের কাছেই তাদের অনেক কিছু শিখার আছে ।তাই তারা সকলে আল্লাহর দরবারে আবেদন করল, 'হে মাবুদ ! তুমি তোমার প্রিয় ইবলিসকে যদি আরশে মুআল্লার কাছে উঠিয়ে আন তবে আমরা তার কাছ থেকে অনেক মূল্যবান উপদেশ শুনে অনেক কিছু শিখতে পারতাম । কেননা, সে আমাদের অপেক্ষা অনেক বেশি জ্ঞান অর্জন করেছে' । 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরেশতাদের এই আবেদন মঞ্জুর  করে ইবলিসকে আরশে মুআল্লার নিকট নিয়ে আসলেন । আরশে মুআল্লার কাছেই রয়েছে ইয়াকুত নির্মিত একটি সুউচ্চ মিম্বর । ইবলিস উক্ত মিম্বরে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হল । স্বীয় ইবাদতের  অবসর সময়ে সে ফেরেশতাদেরকে ওয়াজ-নসীহতও করতে লাগল । ফেরেশতারা তার ওয়াজ ও অমূল্য উপদেশাবলী শুনে মুগ্ধ হয়ে সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল । শেষ পর্যন্ত সে মুআল্লিমুল মালাইকাহ বা  ফেরেশতাদের শিক্ষক  নামে পরিচিত হল ।


বিশেষ দ্রষ্টব্য ঃ উল্লিখিত  অংশের অধিকাংশই "মাওলানা ক্বারী মোহাম্মাদ হাসান " -  এর "কোরআন  হাদিসের আলোকে কাসাসুল আম্বিয়া" - বইটির থেকে  সংগৃহীত করা হয়েছে ।"

ধন্যবাদ ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ